INFO Breaking
Live
wb_sunny

Breaking News

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান (Sources of Ancient Indian History):

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের উপাদান (Sources of Ancient Indian History):


প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান হিসেবে আমরা অতীত ঘটনার ওপর নির্ভরশীল। অতীতের ঘটনাকে জানতে ঐতিহাসিকরা যে তথ্যের ওপর নির্ভর করেন তাই হল ইতিহাসের উপাদান। আরো সহজভাবে বললে, যে সূত্র থেকে ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহ করা হয় তাকেই বলা হয় ইতিহাসের উপাদান। এই উপাদানগুলি হল- যেমন, লিখিত বিবরণ, দলিলপত্র, বিভিন্ন দ্রব্য, নিদর্শন, কোনো চিহ্ন ইত্যাদি। মনে করা হয় যে, গ্রীস, রোমের প্রাচীন ইতিহাস রচনা করেছেন হেরোডোটাস, ট্যাসিটাস, থুকিডিডিস প্রমুখরা।

তাহলে ভারতের ক্ষেত্রে কেন এমন কেউ ছিলেন না? নিশ্চয়ই ছিলেন, তবে তাঁরা বিবরণ লিপিবদ্ধ করে যেতে পারেননি। তাই ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করতে হয়েছে। এই উপাদানগুলি দুভাগে বিভক্ত। প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান এবং সাহিত্যিক উপাদান।

প্রত্নতাত্ত্বিক উপদান (Archaeological Evidence):
প্রত্নতাত্ত্বিক উপদানগুলিকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
  •  লিপি।
  •  মুদ্রা।
  •  স্থাপত্য ও ভাস্কর্য বা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ।

লিপি (Inscriptions):
পাথর, তামা, লোহা, ব্রোঞ্জ ও পোড়ামাটির উপর খোদাই করা লিপি থেকে তৎকালীন রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক এবং ধর্মীয় জীবনযাত্রার পরিচয় পাওয়া যায়। সে জন্য লিপিকে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল বলে অভিহিত করা হয়। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের ভাষা ও বক্তব্যের পরিবর্তন ঘটলেও লিপি সবসময় অপরিবর্তিত থাকে বা তথ্য বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

লিপিকেও দুই ভাগে ভাগ করা যায়—
  •  দেশীয় লিপি।
  •  বিদেশি লিপি।

দেশীয় লিপি (Indigenous Inscriptions):
ব্রাহ্মী, খরোষ্ঠী, তামিল, পালি, সংস্কৃত, প্রাকৃত প্রভৃতি বহু ভাষায় লেখা প্রাচীন ভারতীয় লিপিগুলির প্রধান বিষয়বস্তু ছিল ভারতীয় রাজাদের রাজ্যজয়, রাজপ্রশস্তি, ভূমিদান, শাসন, ধর্ম, রাজনৈতিক ঘটনা, ব্যবসাবাণিজ্য প্রভৃতি। প্রাচীন ভারতের লিপিগুলির মধ্যে 'অশোকের শিলালিপি' সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া হরিসেন বিরচিত 'এলাহাবাদ প্রশস্তি' থেকে সমুদ্রগুপ্তের বিজয় কাহিনী জানা যায়। কলিঙ্গরাজ খারবেলের 'হস্তিগুম্ফা লিপি', প্রতিহাররাজ ভোজের 'গোয়ালিয়র প্রশস্তি', বিজয় সেনের 'দেওপাড়া লিপি', চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীর 'আইহোল লিপি', শকক্ষত্রপ রুদ্রদমনের 'জুনাগড় লিপি' বিশেষ উল্লেখযোগ্য। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোয় প্রাপ্ত লিপির পাঠোদ্ধার আজও হয়নি। দাক্ষিণাত্যের পল্লব, চোল, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট, বাকাটক প্রভৃতি রাজবংশের ইতিহাসের জন্য লিপির উপর নির্ভরশীল হতে হয়। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ, ড: রমেশচন্দ্র মজুমদার, প্রমুখ ঐতিহাসিক উপাদান হিসাবে লিপিকে প্রথম স্থানে রেখেছেন।

বিদেশি লিপি (Foreign Inscriptions):
এশিয়া মাইনর, কম্বোডিয়া, চম্পা, যবদ্বীপ, গ্রিস ও পারস্য প্রভৃতি বৈদেশিক অঞ্চলগুলি থেকে পাওয়া লিপিগুলি থেকে এইসব অঞ্চলের সঙ্গে প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইতিহাস পাওয়া যায়।   

মুদ্রা (Coins):
রাজার নাম ও সাল-তারিখ মুদ্রা থেকে জানা যায়। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও ধাতুবিদ্যার উৎকর্ষতা মুদ্রা মারফত জানতে পারা যায়। মুদ্রায় অঙ্কিত চিত্রের মাধ্যমে সেই রাজার গুণাবলী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা করা যায়। যেমন সমুদ্র গুপ্তের মুদ্রায় বীণাবাদনরত মূর্তি থেকে তাঁর সঙ্গীতানুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। ব্যাকট্রীয়, গ্রিক, শক, কুষান রাজাদের কাহিনী মুদ্রা থেকেই জানতে পারা যায়। সাতবাহন সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান উপাদান হল মুদ্রা। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে ঐতিহাসিক উপাদান হিসাবে মুদ্রার গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।  

স্থাপত্য ও ভাস্কর্য বা প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ (Monumental Evidence):
প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষ, স্মৃতিসৌধ, মন্দির, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদি ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। হরপ্পা, মহেন-জো-দরোর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত না হলে ভারত ইতিহাসের এক অমূল্য অধ্যায় আমাদের কাছে অজ্ঞাত থেকে যেত। সাঁচি, নালন্দা, অজন্তা, ইলোরা, তক্ষশীলা ইত্যাদি অনেক অজানা তথ্যের সন্ধান দেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রাপ্ত ধ্বংসাবশেষ থেকে ভারতবর্ষের বাইরে উপনিবেশ ও সংস্কৃতি বিস্তারের কথা জানতে পারা যায়।

সাহিত্যিক উপাদান (The Literary Elements):
সাহিত্যিক উপাদান মূলত দুই ভাগে বিভক্ত: 
  • দেশীয় সাহিত্য।
  • বৈদেশিক বিবরণ।

দেশীয় সাহিত্য (Indigenous Literature of ancient times):
দেশীয় সাহিত্যকেও প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা যায়—

ধর্মীয় গ্রন্থ (Sacred literature):
প্রাচীন ভারতের অধিকাংশ গ্রন্থ ধর্মকে ভিত্তি করে লেখা। হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলির মধ্যে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ন, মহাভারত, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটক ও জাতক এবং জৈন ধর্মগ্রন্থ কল্পসুত্র ও পরিশিষ্ট পর্বন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রগুলি যেমন, 'নারদ স্মৃতি',  'বৃহস্পতি স্মৃতি',  'মনুস্মৃতি' থেকে প্রাচীন ভারতের আর্থসামাজিক তথ্য সম্পর্কে একটা ধারনা উপলব্ধি করা যায়।

ধর্মনিরপেক্ষ গ্রন্থ (Secular Literature): আইন, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, ব্যাকরণ প্রভৃতি বিষয়ের উপর যে সমস্ত বই লেখা হয়েছিল সে গুলিকে প্রাচীন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গ্রন্থ বলা হয় । এইগুলির মধ্যে কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র', পাণিনির 'অষ্টাধ্যায়ী', পতঞ্জলির 'মহাভাষ্য', ভাসের 'স্বপ্নবাসবদত্তা', শূদ্রকের 'মৃচ্ছকটিকম' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশাখদত্তের 'মুদ্রারাক্ষস' কালিদাসের 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম' ও 'মালবিকাগ্নিমিত্রম' প্রভৃতি নাটক থেকে ইতিহাসের বহু তথ্য সংগৃহিত হয় ।

জীবন চরিত (Biography):
প্রাচীন ভারতের বিভিন্ন রাজাদের জীবনচরিতগুলির মধ্যে বাণভট্ট রচিত 'হর্ষচরিত', সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত 'রামচরিত' বিলহন রচিত 'বিক্রমাঙ্কদেবচরিত' বাকপতি রচিত 'গৌড়বহ' প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এই জীবনচরিতগুলি মূলত রাজাদের সভাকবিদের লেখা বলে পক্ষপাত দোষে দুষ্ট।

আঞ্চলিক ইতিহাস:
স্থানীয় বা আঞ্চলিকভাবে রচিত গ্রন্থের মধ্যে কাশ্মীরের উপর লিখিত কলহন রচিত 'রাজতরঙ্গিনী' সোমেশ্বর রচিত 'রাসমালা' ও 'কীর্তি কৌমুদী' সিংহলী উপাখ্যান 'দ্বীপবংশ' ও 'মহাবংশ' এবং রাজশেখর রচিত 'প্রবন্ধকোষ' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বৈদেশিক বিবরণ (Accounts of  foreign Travelers):
বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের বিবরণ থেকে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের বহু মূল্য উপাদান সংগৃহিত হয়। বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ তিন শ্রেণির। 

গ্রিক বিবরণ:
মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা' অজ্ঞাত পরিচয় গ্রিক নাবিকের লেখা 'পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সি' টলেমির ভূগোল, প্লিনি, কুইন্টাস, কার্টিয়াস, এ্যারিব্যান, প্লুটার্ক, ডায়োডোরাস প্রমুখ গ্রিক ও রোমান লেখকদের রচনা ও বিবরণ বিশেষভাবে স্মরনীয়। 

চৈনিক ভ্রমণবৃত্তান্ত:
গুপ্তযুগে ফা-হিয়েন, হর্ষবর্ধনের আমলে হিউয়েন সাঙ ও ইৎ-সিং এর বিবরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আরব পর্যটকদের বিবরণ:
মুসলিম পর্যটকদের মধ্যে আলবেরুনী রচিত 'তহকক-ই-হিন্দ' এবং আল মাসুদী, আল বিলাদুরি, সুলেমান, হাসান নিজামি প্রমুখদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

0 Comments: