History
কৌটিল্য অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন তার ব্যাখ্যা করো।
রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে কৌটিল্য চুক্তির অনিবার্যতা স্বীকার করেছেন। শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে জনগণের ইচ্ছার ফলশ্রুতি হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রহীন অবস্থার মাৎস্যন্যায় থেকে পরিত্রাণের জন্য জনসাধারণ মনু বৈবস্বতকে রাজা নির্বাচিত করেছিল এবং উৎপাদনের ষষ্ঠাংশ করস্বরূপ নির্ধারণ করেছিল। বিনিময়ে রাজা প্রজাসাধারণের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রাজার প্রধান কর্তব্যই হচ্ছে দণ্ডবিধান করা যাতে বর্ণাশ্রমধর্ম রক্ষা পায়। কৌটিল্য যখন বলেন রাজা নির্বাচিত হন চুক্তির মাধ্যমে, তখন পাশ্চাত্যের সামাজিক চুক্তি মতবাদের সঙ্গে তার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। অবশ্য উভয় চুক্তির মধ্যে মূলগত পার্থক্যও পরিদৃষ্ট হয়। পাশ্চাত্যের দার্শনিক যথা হবস, লক ও রুশোর মতে চুক্তি যেখানে প্রকৃতিগতভাবে সামাজিক, সেখানে কৌটিল্যের চুক্তির প্রকৃতি ছিল সরকারগত। তবে কৌটিল্য এবং হবস উভয়ই চুক্তি সম্পাদনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অরাজক অবস্থার কথা বলেছেন। সেদিক থেকে কৌটিল্য হচ্ছেন হবসের সার্থক পূর্বসূরি।কৌটিল্য রচিত অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রকে সবচেয়ে বড়ো ব্যবসায়ী এবং একচেটিয়া অধিকারভোগী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে যে বিষয়গুলির ব্যাখ্যা অর্থশাস্ত্রে করা হয়েছে, সেগুলি হল-
বৃহৎ রাষ্ট্র গঠন: কৌটিল্য মূলত বৃহৎ রাষ্ট্র গঠনের পক্ষপাতী ছিলেন। কারণ, তাঁর মতে রাষ্ট্র বৃহৎ হলে অনেক বেশি পরিমাণ রাজস্ব সেখান থেকে আদায় করা সহজ হবে এবং এর দ্বারাই শক্তিশালী রাজকোশ ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
আইনের তত্ত্বাবধান: অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত আলোচনায় রাজকীয় অনুশাসনকে আইনের গুরুত্বপূর্ণ উৎসরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে রাজার নৈতিক দায়িত্ব হল আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দোষীদের উপযুক্ত শাস্তিবিধান ও নিরপরাধকে পুরষ্কার প্রদান করা।
মন্ত্রীপরিষদ: কৌটিল্য রচিত অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে যে আলোচনা উপস্থিত সেখানে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সঠিকভাবে চালানোর জন্য মন্ত্রীপরিষদ গঠনের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। রাজা মন্ত্রী ও অন্যান্য রাজকর্মচারীদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রীপরিষদের মাধ্যমে শাসনকার্য চালাবেন বলে উল্লেখ করা হয়।
রাজস্ব নীতি নির্ধারণ: জমি জরিপ করে রাজকর ধার্য করা থেকে শুরু করে, প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ের মাধ্যমে রাজকোশাগার পূর্ণ রাখার নির্দেশ কৌটিল্য প্রদান করেছেন, যা প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে বিশেষভাবে সাহায্য করে।
সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব: রাষ্ট্রনীতির অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে অর্থশাস্ত্রে সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। কৌটিল্য রাষ্ট্রকে জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করে এর সাতটি অঙ্গের উল্লেখ করেছেন, যথা-স্বামী, অমাত্য, জনপদ, দুর্গ, কোশ, দণ্ড ও মিত্র।
মন্ডল তত্ত্ব: অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত আলোচনায় মণ্ডল তত্ত্ব-এর গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিটি রাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্র স্বভাবশত্রু এবং স্বভাবশত্রুর পরের রাষ্ট্র স্বভাবমিত্র-এই নিরিখে কৌটিল্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেছেন।
পররাষ্ট্রনীতি: অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত আলোচনায় পররাষ্ট্রনীতিও গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রেতিনি কয়েকটি আদর্শের কথা বলেছেন, যথা-সন্ধিবিগ্রহ, নিরপেক্ষতা, যুদ্ধপ্রস্তুতি, অন্যের আশ্রয়, দ্বৈধীভাব প্রভৃতি।

0 Comments: