আলিগড় আন্দোলনের পটভূমি:
আলিগড় আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণ শুরু হয়। পাশ্চাত্য শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে হিন্দুরা সরকারি উচ্চপদগুলি অধিকার করে এবং সমাজে নিজেদের অবস্থানকে উন্নত করে। কিন্তু মুসলিমরা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি সন্দিহান ও ক্ষুব্ধ থাকায় তারা ব্রিটিশ শাসন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজে তারা পিছিয়ে পড়ে। সৈয়দ আহমেদ, থিওডোর বেক -সহ কিছু নেতা এই পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালান।মুসলিম নেতৃবর্গ মুসলমানদের এটা বোঝাতে পেরেছিলেন যে, ব্রিটিশদের সঙ্গে আপস মীমাংসায় পৌঁছোলে এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের সব সুযোগসুবিধা গ্রহণ করলে আখেরে মুসলমান সম্প্রদায়েরই লাভ হবে।
আলিগড় আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য:
- মুসলিমদের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল আলিগড় আন্দোলন। আলিগড় আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মুসলিম সমাজের আধুনিকীকরণের চেষ্টা শুরু হয়েছিল।
- ঔপনিবেশিক ভারতে হিন্দুদের সমতুল্য হয়ে ওঠার জন্য মুসলিমদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্য নিয়েই শুরু হয় আলিগড় আন্দোল।
- আলিগড় আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে মুসলিমদের মধ্যে বিজ্ঞানধর্মী মানসিকতা গঠনের চেষ্টা শুরু হয়। এই সুবাদেই গড়ে ওঠে 'সায়েন্টিফিক সোসাইটি'।
আলিগড় আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য:
আলিগড় আন্দোলনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল—
- আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল, ব্রিটিশদের সাহায্যে বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচির দ্বারা সমাজের মুসলিম শ্রেণির সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটানো।
- এই আন্দোলনে বাধা দিয়েছিল সংস্কারবিমুখ গোঁড়া মৌলবি ও মোল্লারা।
- আলিগড় আন্দোলনের মূল উৎস আলিগড় কলেজে সমাজের সকল শ্রেণির ছাত্রদের প্রবেশ করার অধিকার ছিল না। তাই এই আন্দোলনে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেনি।
- এই আন্দোলনের দুটি ধারা দেখা যায় — একটি রক্ষণশীল ব্রিটিশবিরোধী। অপরটি আধুনিক প্রগতিশীল ও ব্রিটিশ অনুরাগী।
আলিগড় আন্দোলনের গুরুত্ব:
আলিগড়ের আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল নিম্নরূপ—
দ্বিজাতিতত্ত্বের অবতারণা: আলিগড় আন্দোলনের সূত্রেই ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু-মুসলিম দুটি আলাদা জাতি — এই ধারণার উদ্ভব ঘটে।
বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম: আলিগড় আন্দোলন ভারতীয়দের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদের বীজ রোপণ করে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষময় পরিণতি হিসেবে পরবর্তী সময়ে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক ঐক্য ভেঙে পড়ে।
ভারত বিভাজন: আলিগড় আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব হিসেবে ভারত বিভাজনের পথ প্রস্তুত হয়। পরবর্তীকালে জিন্নাহ্ - সহ মুসলিম লিগের নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের জন্য আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি তোলেন।
আলিগড় আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা:
আলিগড় আন্দোলনের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। যেমন—
সাম্প্রদায়িক রূপ: আলিগড় আন্দোলন আগাগোড়া ধর্মীয় সংকীর্ণতায় আবদ্ধ ছিল এবং এর সাম্প্রদায়িক রূপ বীভৎস ও কদর্য হয়ে ধরা পড়েছিল।
শহরকেন্দ্রিক আন্দোলন: শিক্ষিত শহরকেন্দ্রিক বিত্তশালী শ্রেণির মধ্যে এই আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল। এই আন্দোলন এক সংকীর্ণ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকায় সারা দেশজুড়ে প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
গণমুখিনতার অভাব: সমাজে মুসলমানদের গরিষ্ঠ অংশের প্রতি কোনো কর্মসূচি না নেওয়ায় আন্দোলন গণমুখী হয়নি।

0 Comments: