ওয়াহাবি কথার অর্থ হল 'নবজাগরণ'। তাই ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসলাম ধর্মের প্রচলিত সংস্কার গুলি দূর করে পবিত্র কোরানের আলোকে ইসলামের শুদ্ধিকরণ। এই কাজে তারা আরবের নেতা আব্দুল ওয়াহাবের আদর্শ অনুসরণ করে এই আন্দোলন সংগঠিত করেন। যার মূল কথা হলো 'ইসলাম ধর্মের সংস্কার সাধন করা'।
ভারতবর্ষে ওয়াহাবি আন্দোলন শুরু করেন দিল্লির বিখ্যাত মুসলিম সন্ত শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও তার পুত্র আজিজ। তবে ভারতবর্ষে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রায়বেরিলির অধিবাসী সৈয়দ আহমদ।
তিতুমিরের নেতৃত্বে বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলন:
বাংলায় ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন মির নিশার আলি যিনি তিতুমির নামে পরিচিত। তিতুমির ২৪ পরগনা জেলার বাদুড়িয়া থানার অন্তর্গত হায়দারপুর গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ৩৯ বছর বয়সে মক্কায় হজ করতে গিয়ে সৈয়দ আহমদের সংস্পর্শে আসেন এবং দেশে ফিরে ইসলামধর্মের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে এই আন্দোলন কৃষক আন্দোলন -এ পরিণত হয়েছিল। বারাসত অঞ্চলে তিতুমিরের এই আন্দোলন 'বারাসত বিদ্রোহ' নামেও পরিচিত।
তিতুমিরের বিরুদ্ধে জমিদারদের প্রতিক্রিয়া:
তিতুমিরের প্রভাবে ২৪ পরগনা, নদিয়া, মালদহ, রাজশাহি, ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলের কৃষকরা ওয়াহাবি আন্দোলন শুরু করলে জমিদার নীলকর সাহেব ও মুসলমান মোল্লারা তিতুমিরের বিরোধিতা শুরু করে। পুড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায় তিতুমিরের অনুগামীদের দমন করার জন্য দাড়ির উপর ২.৫ টাকা কর ধার্য করেছিলেন। ফলে জমিদারের সঙ্গে তিতুমিরের অনুগামীদের সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল।
বারাসত বিদ্রোহের প্রসার:
তিতুমির বারাসতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেকে স্বাধীন বাদশাহ বলে ঘোষণা করেছিলেন ও মইনউদ্দিন নামে এক অনুগামীকে প্রধানমন্ত্রী এবং ভাগ্নে গোলাম মাসুমকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করার পরিকল্পনা করেন। তিনি নারকেলবেড়িয়ার সদর দপ্তরে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করে ওই অঞ্চলের জমিদারদের কাছে রাজস্ব দাবি করেন।
বারাসত বিদ্রোহের গুরুত্ব:
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওয়াহাবি আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। তিতুমিরের নেতৃত্বে পরিচালিত ওয়াহাবি আন্দোলন ধর্মসংস্কার আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও এটি কৃষক বিদ্রোহের রূপ পরিগ্রহণ করেছিল। অত্যাচারী জমিদার ও নীলকর সাহেবদের হাতে নির্যাতিত মানুষদের সংগঠিত করে তিতুমির বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক প্রেরিত ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি প্রাণপণ সংগ্রাম করেছিলেন।
বারাসত বিদ্রোহের অবসান:
তিতুমিরের বিরুদ্ধে স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবরা গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্কের শরণাপন্ন হলে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে লর্ড বেন্টিঙ্কের তার বিরুদ্ধে এক অভিযান প্রেরন করেন এবং কামানের আঘাতে বাঁশেরকেল্লা ধ্বংস হয়। তিতুমীর ও তার কয়েকজন অনুগামী বীরের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন। বন্দি সৈন্যদের ফাঁসি হয় এবং অনেকে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ভোগ করেন।

0 Comments: