INFO Breaking
Live
wb_sunny

Breaking News

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র:

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র:


১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এটি সিপাহি বিদ্রোহ। আবার কেউ মনে করেন এটি জাতীয় বিদ্রোহ। কেউ একে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলেছেন কারও মতে এটি গণবিদ্রোহ আবার কেউ কেউ একে সামন্ত বিদ্রোহ বলে উল্লেখ করেছেন।


সিপাহী বিদ্রোহের পক্ষে মতামত:
তৎকালীন ভারত–সচিব আর্ল স্ট্যানলি এক প্রতিবেদনে মহাবিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ বলে উল্লেখ করেন। এই মতকে সমর্থন করেন জন লরেন্স, চালর্স রেক্স, টি. আর. হোমস, আল রবার্টস প্রমুখ ইতিহাসবিদ। ভারতীয়দের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, কিশোরীচাঁদ মিত্র, দাদাভাই নৌরোজি, অক্ষয়কুমার দত্ত, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় শম্ভুচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ আহমেদ খান প্রমুখ মহাবিদ্রোহকে সিপাহি বিদ্রোহ বলেছেন। কিশোরীচাঁদ মনে করেন এই বিদ্রোহ ছিল একান্তভাবেই সিপাহিদের অভ্যুত্থান।

জাতীয় বিদ্রোহের পক্ষে মতামত:
স্বদেশপ্রেমের নিরিখে যদি আমরা জাতীয়তাবাদের বিচার করি, তাহলে অবশ্যই মহাবিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলা যায়। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার ডাফ, আউট্রাম, জে.বি. নটন, জন কে, চেলসি বল, ম্যালেসন খেঁরা, ইংল্যান্ডের রক্ষণশীল টোরি দলের নেতা বেনজামিন ডিজরেলি তাই মহাবিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহের আখ্যা দিয়েছেন। কার্ল মার্কস নিউইয়র্ক ডেইলি ট্রাইবুন (New York Daily Tribune) পত্রিকায় (১৮৫৭ খ্রিঃ) লেখেন– 'অনেকে যাকে সেনাবিদ্রোহ মনে করছেন, সেটি আসলে জাতীয় বিদ্রোহ।'

গণবিদ্রোহের পক্ষে মতামত:
উত্তর ও মধ্য ভারতে সিপাহিদের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীরা যোগ দিয়ে একে গণবিদ্রোহের রূপ দিয়েছিল। লখনউ, অযোধ্যা, মজফফরনগর, সাহরানপুর প্রভৃতি অঞ্চল ছিল এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। বিহারের পশ্চিমদিকে ও পাটনার বহু জেলায় সাধারণ মানুষ সিপাহিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে। ড. শশীভূষণ চৌধুরী তাঁর 'সিভিল রেবেলিয়ান ইন দ্য ইন্ডিয়ান মিউটিনিস' গ্রন্থে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের অভ্যুত্থানকে গণবিদ্রোহ বলেছেন। জে.বি. নর্টন তাঁর 'টপিক্স ফর ইন্ডিয়ান স্টেটসম্যান' গ্রন্থে লিখেছেন– 'এই বিদ্রোহ যতটা না সিপাহি বিদ্রোহ ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল গণবিদ্রোহ' (a more rebellion of the people than merely a mutiny of the soldiers)I

সামন্ত বিদ্রোহের পক্ষে মতামত:
সামন্তশ্রেণি এই বিদ্রোহে যেভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এগিয়ে এসেছিল তা লক্ষ করে ড. রজনীপাম দত্ত ও মানবেন্দ্রনাথ রায় এই বিদ্রোহকে সামন্ততান্ত্রিক অভ্যুত্থানেরই নামান্তর বলেছেন। তাঁদের মতে, বিদ্রোহীরা ব্রিটিশের পরিবর্তে মোগল বা মারাঠাদের নেতৃত্বে সামন্ততান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। তাঁরা মহাবিদ্রোহকে ক্ষয়িষ্ণু ও পতনোন্মুখ সামন্তপ্রভুদের আত্মস্বার্থরক্ষার অন্তিম প্রতিক্রিয়াশীল প্রয়াস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ:
সিপাহি বিদ্রোহের প্রকৃতি বর্ণনা প্রসঙ্গে দেশপ্রেমিক বিনায়ক দামোদর সাভারকর' দ্য ইন্ডিয়ান ওয়ার অব ইন্ডিপেন্ডেন্স' গ্রন্থে মহাবিদ্রোহকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ রূপে উল্লেখ করে বলেছেন এটা ছিল একটি পরিকল্পিত জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ' (a planned war of nation independence)। তাকে সমর্থন করেছেন অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক সুশোভন সরকার, পি. সি. জোশি, সুরেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখ। পি. সি. জোশি '1857 in Our History' —প্রবন্ধে মহাবিদ্রোহকে স্বাধীনতার যুদ্ধ বলেছেন।

   সিপাহি বিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আজও মেটেনি। তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে ড. হরপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক রণজিৎ গুহ, ড. মুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ সিপাহি বিদ্রোহে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নেতৃত্ব দান ও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে অধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

0 Comments: