উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ভারতে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে যে সমস্ত উপজাতি বিদ্রোহ ঘটে তার মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক ছিল ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দের সাঁওতাল বিদ্রোহ।
সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ:সাঁওতালরা হাজারিবাগ, মানভূম থেকে রাজমহলের পার্বত্য সমতলভূমিতে এসে, সেখানকার জঙ্গলাবৃত অঞ্চল পরিষ্কার করে বসবাস ও কৃষিকাজ শুরু করে অঞ্চলটির নাম দেয় ‘দামিন-ই-কোহ' বা মুক্ত অঞ্চল। কিন্তু সেখানে তারা জমিদার, মহাজন, বহিরাগত ব্যবসায়ী ও ইংরেজদের অত্যাচারে। অতিষ্ঠ হয়ে শেষপর্যন্ত বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়।
সাঁওতাল বিদ্রোহের লক্ষ্য:
বিদ্রোহীদের লক্ষ্য ছিল বহিরাগত মহাজন (দিকু) ও ব্যবসায়ীদের অত্যাচার ও এবং জমিদারি ও ব্রিটিশ শাসনের উচ্ছেদ ঘটিয়ে সাঁওতাল রাজ প্রতিষ্ঠা করা।
সাঁওতাল বিদ্রোহের শুরু:
১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন সিধু-কানহুর নেতৃত্বে প্রায় দশ হাজার সাঁওতাল নরনারী ভাগনাডিহির মাঠে জমায়েত হয়ে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য গঠনের পরিকল্পনা নেন। দীঘি থানার অত্যাচারী দারোগা মহেশলাল দত্ত ও কুখ্যাত মহাজন কেনারাম ভগৎকে হত্যার মাধ্যমে এই বিদ্রোহ শুরু হয়।
সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব ও ব্যাপ্তি:
বিদ্রোহীরা সিধু, কানহু, ডোমন মাঝি, চাঁদ, ভৈরব, কালো প্রামাণিকের নেতৃত্বে মহাজনদের আড়ত, বণিকদের বাড়ি, নীলকুঠি ও জমিদারের কাছারি আক্রমণ করে। রেলস্টেশন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে। এভাবে রাজমহল থেকে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুর্শিদাবাদ, বীরভূমে পাকুড় ও সাঁওতাল পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইংরেজবাহিনী পর্যদস্তু হয়ে পড়ে। সবশেষে বিদ্রোহীরা। তির, ধনুক, বল্লম সম্বল করে কলকাতা দখলের উদ্দেশ্যে দল বেঁধে। বেরিয়ে পড়লে শেষপর্যন্ত ইংরেজ কোম্পানি প্ৰচণ্ড দমনপীড়নের মাধ্যমে এই বিদ্রোহ দমন করে (১৮৫৬ খ্রিঃ)।
সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রকৃতি:
ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা একে নিছক বর্বরদের স্থানীয় বিদ্রোহ ও আদিম ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ বললেও আধুনিক ঐতিহাসিকরা একে দেশীয় শোষণ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরদ্ধে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক গণসংগ্রাম তথা শ্রমজীবীদের প্রতিরোধ হিসেবে দেখেছেন।
সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল:
এই বিদ্রোহের ফলে-
- সরকার সকল পরগনা নামে একটি স্বতন্ত্র সংরক্ষিত এলাকা সৃষ্টি করে সেই সাঁওতালদের আইনকানুন চালু করে।
- সাঁওতালদের উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং মিশনারি ছাড়া সমতলের লোকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়।
- সাঁওতাল মোড়ল ও সর্দারদের স্বীকার করা হয়।
- সর্বত্র একই ধরনের ওজন বিধি চাল।

0 Comments: