History
চুয়াড় বিদ্রোহ: চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ: চুয়াড় বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য: চুয়াড় বিদ্রোহের গুরুত্ব:
ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন-শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতে যে সকল উপজাতি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তারমধ্যে মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, ঘাটশিলা প্রভৃতি অঞ্চলের 'চুয়াড় বিদ্রোহ' ছিল অন্যতম।
'চুয়াড়' কারা:
'চুয়াড়' শব্দটির অর্থ হলো দুর্বৃত্ত বা নিচ জাতিভুক্তত সম্প্রদায়৷ এরা স্থানীয় জমিদারদের অধীনে রক্ষীবাহিনীর কাজ করতো। তাই এরা 'পাইক' নামেও পরিচিত। এই কাজের বিনিময় তারা কিছু নিষ্কর জমিও ভোগ করতে পারত।
চুয়াড় বিদ্রোহের কারণ: (পটভূমি)
বিভিন্ন কারণে চুয়াড় বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এগুলি হল নিম্নরূপ:
উচ্চরাজস্ব: কোম্পানি উচ্চহারে রাজস্ব ধার্য করলে এবং তা আদায় করলে জমিদার ও চুয়াড় কৃষকরা চরম সংকটের সম্মুখীন হয়।
সূর্যাস্ত আইন: গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় এক নতুন ধরণের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা চালু করেন। যা 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' নামে পরিচিত। এই বন্দোবস্তের অন্যতম ধারা 'সূর্যাস্ত আইন' দ্বারা বহু জমিদারের জমিদারি গ্রাস করা হলে তাদের কর্মচারীরাও নিষ্কর জমির ভোগদখল হারায়।
বেকারত্ব বৃদ্ধি: জমিদারের জমিদারি গ্রাস করা হলে তাঁদের অধীনে চুয়াড়ও তাদের পাইকের কাজ হারায়।
রাজস্ব আদায় ও অত্যাচার: সূর্যাস্ত আইনে একদিকে বহু জমিদার জমিদারি হারায় অন্যদিকে কোম্পানির নতুন নতুন জমিদার তৈরি হয়। রাজস্ব আদায়ের নামে এদের অত্যাচার চুয়াড়দের বিদ্রোহী করে তোলে।
চুয়াড় বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য: (চরিত্র)
সশস্ত্র বিদ্রোহ: এই বিদ্রোহ ছিল চুয়ার উপজাতি সম্প্রদায়ের সশস্ত্র বিদ্রোহ।
জমিদার ও পাইকের যৌথ বিদ্রোহ: কোম্পানির সূর্যাস্ত আইনের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত জমিদার ও তাঁদের পাইকরা (চুয়াড়রা) একসঙ্গে বিদ্রোহ শুরু করে।
দুটি পর্যায়ের আন্দোলন: ১৭৬৮-১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই বিদ্রোহ মূলত দুটি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। প্রথম পর্যায়টি ১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে এবং দ্বিতীয় পর্যায়টি ১৭৯৮-৯৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়।
চুয়াড় বিদ্রোহের গুরুত্ব:
১৮০০ সালের জানুয়ারি মাসে গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি অনেক চেষ্টায় এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এই বিদ্রোহের ফলে,
- চুয়ারদের এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল যা পরবর্তীকালে ভারতের শিক্ষিত শিক্ষিত সম্প্রদায়কে অনুপ্রাণিত করেছিল প্রায় ১০০ বছর পরে।
- জমিদার ও কৃষকরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই বিদ্রোহের শামিল হয়েছিল যা সচরাচর লক্ষ্য করা যায় না।
- তাদের এই আন্দোলনের ফলে বিষ্ণুপুর শহরকে কেন্দ্র করে দুর্গম বনাঞ্চলকে নিয়ে জঙ্গলমহল নামে একটি বিশেষ জেলা গঠন করতে ব্রিটিশরা বাধ্য হয়।
- পরবর্তীকালে ভূমি রাজস্ব নির্ধারণের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অধিকতর সাবধানতা অবলম্বন করতে বাধ্য হয়।

0 Comments: