INFO Breaking
Live
wb_sunny

Breaking News

প্রাচীন ভারতে আদি পুরা-প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির আলোচনা:

প্রাচীন ভারতে আদি পুরা-প্রস্তর যুগের সংস্কৃতির আলোচনা:


ভারতে প্রাক্-ঐতিহাসিক পর্ব মূলত পুরা-প্রস্তর, মধ্য-প্রস্তর, নিম্ন (নব্য)-প্রস্তর এবং তাম্র-প্রস্তর যুগের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। এর সূচনা ঘটেছিল এখন থেকে প্রায় ২০ লক্ষ বছর পূর্বে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এটি বিভিন্ন সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। আনুমানিক ১৫০০ খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ পাঞ্জাব অঞ্চলে ঋকবৈদিক সভ্যতার বিকাশ ঘটলেও সমগ্র দক্ষিণ ভারত সহ ভারতীয় উপমহাদেশের নানান স্থানে প্রাক্-ঐতিহাসিক যুগের লক্ষণ পরবর্তীকালে বজায় ছিল। প্রাক্-ঐতিহাসিক যুগের পুননির্মাণের উপাদানগুলির মধ্যে অন্যতম হল- বিভিন্ন ধরণের হাতিয়ার, ধ্বংসাবশেষ, জীবাশ্ম, নরকঙ্কাল, সমাধিক্ষেত্র, মানুষের বাসভূমি ইত্যাদি।

পুরা-প্রস্তর যুগের শ্রেণীবিভাগ:
পুরা-প্রস্তর যুগকে আমরা তিনটি ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করতে পারি।
  •  নিম্ন বা আদি পুরা-প্রস্তুর যুগ।
  •  মধ্য পুরা-প্রস্তর যুগ
  •  নব্য পুরা-প্রস্তর যুগ।
পুরা-প্রস্তর যুগের আয়ুধের নিদর্শন: 
ভীমবেটকার ৩-এফ-২৪ গুহায় পাথরের দেওয়ালে ১৬৮ মিটার গভীর ৭টি বাটির মত গর্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। ভীমবেটকা ছাড়াও মধ্যপ্রদেশের মাইহারে চ্যালসিডিনি পাথরে নির্মিত ছিদ্রযুক্ত চাকতি আবিষ্কৃত হয়েছে। রাজস্থানের দিদওয়ানার সিঙ্ঘি তালাও-এ নিম্ন পুরা-প্রস্তর যুগের ৬টি স্ফটিকের টুকরো পাওয়া গেছে। এছাড়া পুরা-প্রস্তর যুগের মানুষেরা অস্ট্রিচ পাখির ডিমের খোলা দিয়ে পুতি বা 'ডিস্ক' (Disc) জাতীয় অলংকার নির্মাণ করত। ভীমবেটকা, পাটনি সহ প্রায় ৪১টি কেন্দ্রে এরূপ সামগ্রী পাওয়া গেছে।

পুরা-প্রস্তর সংস্কৃতির বসতি:
পুরা-প্রস্তর যুগের মানুষ পাথর, গাছের ডাল, ঘাস ও লতাপাতা দিয়ে নির্মিত স্থানে বসবাস করত। বসতিগুলির বেশিরভাগই ছিল অল্প সময় থাকার জন্য ক্যাম্প (Camp) জাতীয়। হুন্সগিতে আবার বহু বছরের বসতি আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়াও বসতিগুলির কোনোটি ছিল পাথরের আয়ুধ নির্মাণের কেন্দ্র (Factory), কোনোটি আবার ছিল পশু কাটার স্থান।।

পুরা-প্রস্তর যুগের মানুষের খাদ্য:
নৃতাত্ত্বিক গবেষণার ভিত্তিতে পুরা-প্রস্তর যুগের মানুষের গৃহীত সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। অন্ধ্রপ্রদেশের কাডাপায় গুঞ্জনা নদীর উপত্যকায় পশু, মাছ, পাখি, কন্দমূল, নানা ধরণের পাতা, বুনো ফল (খাদ্যোপযোগী)-এর নিদর্শন পাওয়া গেছে। কে পাড্ডায়-এর গবেষণায় হুন্সগি উপত্যকায় খাদ্যোপযোগী কয়েক ধরণের বুনো ফল এবং হরিণের অবশেষের প্রমাণ উঠে এসেছে। বলা যায়, পুরা-প্রস্তর যুগের মানুষ খাদ্যোপযোগী বুনো ফল, মাছ এবং পশুর মাংস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত।

পুরা-প্রস্তর যুগের মানুষের সমাজ-বিন্যাস:
পুরা-প্রস্তর যুগের মানুষ ছিল মূলত শিকারী ও খাদ্য-সংগ্রাহক। তারা 'গোষ্ঠী সমাজ' (Band Society)। প্রতিটি গোষ্ঠীতে মোটামুটিভাবে ১০০ জনের কম লোক থাকত। গোষ্ঠীগুলি রক্ত সম্পর্কিত কয়েকটি পরিবার নিয়ে গঠিত হত। গোষ্ঠীগুলিতে কোনো সরকার বা প্রশাসন, রাজা বা গোষ্ঠীপতি ছিলেন না।

পুরা-প্রস্তর যুগের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ:
পুরা-প্রস্তর যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল,
  •  এই যুগে মানুষ ভোঁতা ও বৃহৎ পাথর দিয়ে তৈরি অস্ত্র ব্যবহার করত। অনেক সময় কাঠ বা পশুর হাড়ও অস্ত্রের কাজে ব্যবহার করা হত।
  •  পুরা-প্রস্তর যুগেই সম্ভবত মানুষ আগুনের ব্যবহার সম্পর্কে পরিচিত হয়। পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালানোর কৌশল তারা আবিষ্কার করেছিল। এই যুগের মানুষ প্রধানত গুহাবাসী।
  •  এই যুগে কৃষিকাজ বা খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতি তাদের অজানা ছিল। তারা মূলত ছিল শিকারী। পশু, পাখি, মাছ প্রভৃতি তারা শিকার করত এবং বনের ফলমূল সংগ্রহ করত। এই কারণে তাদের 'খাদ্য সংগ্রহকারী' বলে চিহ্নিত করা যায়। আগুনে ঝলসে তারা পশুর মাংস ভক্ষণ করত। মৃত পশুর চামড়া ও গাছের পাতা ও ছাল দিয়ে শরীর আচ্ছাদিত রাখত।
  •  পুরা-প্রস্তর যুগের শেষের দিকে পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে। পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে গিয়ে তারা অস্ত্র-শস্ত্র মসৃণ ও উন্নত করে তুলতে কিছুটা সফল হয়।
  •  ধনুকের ব্যবহার তারা শুরু করে এবং বল্লম ছোঁড়ার জন্য এক প্রকার যন্ত্রের উদ্ভাবন করে। কৃষিকাজ তখনও তাদের অজানা থাকলেও এই সময় থেকেই মানুষ পশুপালন শুরু করে।

এপিপ্যালিওলিথিক যুগ:
মধ্য-গাঙ্গেয় উপত্যকায় এলাহাবাদ, প্রতাপগড়, জৌনপুর, সুলতানপুর, বারাণসী ইত্যাদি স্থানগুলিতে ভাঙ্গর বা গঙ্গার পলিমাটিতে প্রচুর পরিমানে পাথরের হাতিয়ার পাওয়া গেছে। এই পাথরের হাতিয়ারগুলির আকার উচ্চ পুরা-প্রস্তর যুগের থেকে ছোটো; অথচ ক্ষুদ্র-প্রস্তর বা মাইক্রোলিথের চেয়ে বড়। পুরা-প্রস্তর-ক্ষুদ্র-প্রস্তর সংস্কৃতির বিবর্তনের এই স্তরটি পুরাতাত্ত্বিক পরিভাষায় 'এপিপ্যালিওলিথিক যুগ' (Epipaleolithic Age) বলে চিহ্নিত হয়। এই স্তরটিকে সাধারণভাবে উচ্চ বা অন্তিম পুরা-প্রস্তর যুগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

0 Comments: