ভূ-অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম ভাবে সৃষ্টি হওয়া কোন কম্পন যখন আকস্মিকভাবে ভূপৃষ্ঠের কিছু অংশকে ক্ষণিকের জন্য প্রচন্ড বা মৃদু আন্দোলিত করে তখন তাকে ভূমিকম্প বলে। ভূপৃষ্ঠ থেকে সাধারণত ৫-৭০০ কিমি গভীরতায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। পৃথিবীতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ লক্ষ বার ভূমিকম্প হয়।
ভূমিকম্পের কারণ:ভূমিকম্পের জন্য দায়ী প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক কারণগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল:—
ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক কারণ:
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত:
আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের সময় গ্যাস, জলীয় বাষ্প ও উত্তপ্ত তরল পদার্থ প্রচণ্ড জোরে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে আসলে ভূমিকম্প হতে পারে।
ধস:
বৃষ্টিপাতের ফলে পার্বত্য অঞ্চলে ধস নামলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
পাতের সঞ্চরণ:
পাতসংস্থান তত্ত্ব অনুযায়ী দুটি পাত পরস্পরের অভিমুখে অগ্রসর হলে বা পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলে বা পাশাপাশি ঘর্ষণ করে অগ্রসর হলে পাতের সংযোগরেখা বরাবর শিলাচ্যুতি ঘটে এবং ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।
হিমানী সম্প্রপাত:
পার্বত্য অঞ্চলে বিশাল বরফের স্তূপ হিমানী সম্প্রপাতরূপে ধসে পড়লে ভূমিকম্প হয়।
ভঙ্গিল পর্বতের উত্থান:
ভূ-আলোড়নের ফলে ভঙ্গিল পর্বতের উত্থানের সময় প্রবল ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
উল্কাপাত:
মহাকাশ থেকে খসে পড়া উল্কার আঘাতেও ভূমিকম্প হয়।
যেমন:— আমেরিকার অ্যারিজোনায় উল্কাপাতের ফলে একটি বিরাট গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছিল, যাকে ‘শয়তানের খাদ’ নাম দেওয়া হয়।
অপ্রাকৃতিক বা কৃত্রিম কারণ:
জলাধারের চাপ, ভূগর্ভে পারমাণবিক বোমা বা ডিনামাইট বিস্ফোরণ, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খনিজ পদার্থ উত্তোলনের ফলে খনির ছাদে ধস নেমেও ভূমিকম্প হতে পারে।
ভূমিকম্পের ফলাফল:
ভূমিকম্পের ফলাফল বা প্রভাবগুলি হল—
জীবন ও সম্পত্তিহানি:
ভূমিকম্প ঘটার ফলে অনেকসময় বাড়িঘর চাপা পড়ে বা ভেঙে যায়। এর ফলে অনেক মানুষ ও গৃহপালিত জন্তুর মৃত্যু হয় এবং সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নষ্ট হয়।
পরিবহণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়া:
ভূমিকম্পের ফলে রাস্তাঘাট, রেললাইন বেঁকে যাওয়া, বসে যাওয়া এবং ধসের জন্য ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ফলে পরিবহণ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
জলাধার ভেঙে হঠাৎ বন্যার সম্ভাবনা:
বড়ো জলাধারের বিপুল জলরাশির চাপে ভূমিকম্প হলে বাঁধ ভেঙে হঠাৎই বন্যা ঘটতে পারে।
যেমন:— মহারাষ্ট্রের কয়নাতে ১৯৬৭ সালে এইভাবে ভূমিকম্প ও তার ফলে বন্যা হয়েছিল।
সুনামির সৃষ্টি:
সমুদ্র তলদেশে সৃষ্ট ভূমিকম্প প্রবল সামুদ্রিক ঢেউ সৃষ্টি করে। ওই ঢেউ উপকূলভাগে আছড়ে পড়ে উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক জীবন ও সম্পত্তি হানি ঘটায়।
যেমন:— ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরের তলদেশে (সুমাত্রার নিকট) সৃষ্ট ভূমিকম্পে যে সুনামি সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে ১১ টি দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং প্রায় ৩ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি হয়।
নতুন ভূভাগ সৃষ্টি:
অনেকসময় আন্তঃসাগরীয় এলাকা ভেসে উঠে নতুন ভূভাগ তৈরি করে।
যেমন:— সম্প্ৰতি ২০১৩ সালে করাচির নিকট এরুপ একটি কাদার দ্বীপ তৈরি হয়েছে।
বন্দর গঠনে সহায়তা:
ভূমিকম্পের ফলে অনেকসময় উপকূলবর্তী ভূমিভাগ নিমজ্জিত হয়ে বন্দর গঠনের পক্ষে সাহায্য করে।

0 Comments: